ভুয়া সনদে এমপিওভুক্ত তিনজন, বৈধ শিক্ষক বঞ্চিত আট বছর ধরে

ভুয়া সনদে এমপিওভুক্ত তিনজন, বৈধ শিক্ষক বঞ্চিত আট বছর ধরে

জাল সনদে তিন শিক্ষক এমপিওভুক্ত হলেও আট বছরের বেশি সময় ধরে এক বৈধ শিক্ষক এমপিওভুক্ত হননি। প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির নিয়োগ দুর্নীতির কারণে এমপিওবঞ্চিত নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার মাগুড়া উচ্চবিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান।

পরীদর্শন ও নিরীক্ষণ অধিদফতরের (ডিআইএ) তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, এমপিওবঞ্চিত সহকারী শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামানসহ ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫ সালে চার জন শিক্ষক নিয়োগ পান। মো. মনিরুজ্জামান শূন্যপদে নিয়োগ পান ২০১৩ সালের ৩০ নভেম্বর। নিয়োগের পর প্রতিষ্ঠান থেকে এই মনিরুজ্জামানসহ চার শিক্ষকের এমপিওভুক্তির আবেদন জানানো হয়। এমপিওভুক্তির জন্য শাখা যাচাইয়ে বিদ্যালয়ের ফাইল ফেরত পাঠান উপপরিচালক। এর মধ্যেই শাখা যাচাই-বাছাই ছাড়াই চার শিক্ষকের মধ্যে সহকারী শিক্ষক লাকী আক্তার এমপিওভুক্ত হয়ে যান। বাদ পড়েন মনিরুজ্জামান।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে মো. লতিফুজ্জামান ডিগ্রি পাসের জাল সনদে এমপিওভুক্তি হন। আর সমাজবিজ্ঞানের মণিকা রাণী এমপিওভুক্ত হন ভুয়া শিক্ষক নিবন্ধন দিয়ে।

ডিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, লতিফুজ্জামানের রোল নম্বরের সনদটি মো. সাইফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির। আর মণিকা রাণীর রোল নম্বরের সনদটি মো. মিজানুর রহমানের। ফলে লতিফুজ্জামান ও মণিকা রাণীর নিয়োগ অবৈধ।

তদন্ত প্রতিবেদনে লতিফুজ্জামানের কাছ থেকে ৯ লাখ ৬ হাজার ৩৬০ টাকা এবং মণিকা রাণীর কাছে থেকে ৯ লাখ ৬ হাজার ৩৯০ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতের সুপারিশ করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনের পর এই দুই শিক্ষকের এমপিও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদফতর থেকে স্থগিত করা হয়। কিন্তু এমপিও কোড বিদ্যমান থাকায় সমাজবিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক মনিরুজ্জামানের এমপিওভুক্তি আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে না। ফলে এই শিক্ষক এমপিও-বঞ্চিত থাকেন।

সর্বশেষ বিদ্যালয়ে আরও এমটি শ্রেণি শাখা অনুমোদনের শাখার বিপরীতে এমপিওভুক্তির আবেদন করেন মনিরুজ্জামান। কিন্তু আঞ্চলিক পরিচালক অফিস এমপিও আবেদন আটকে দেন।

এ বিষয়ে বঞ্চিত শিক্ষক মনিরুজ্জামান বলেন, ‌‘সমাজবিজ্ঞানে দুজন শিক্ষকের বেতন কোড বিদ্যমান থাকায় আগে এমপিও আবেদন গ্রহণ করা হয়নি। আর এখন শাখা অনুমোদনের পর এমপিওভুক্তির সুযোগ থাকলেও এমপিওভুক্ত করা হচ্ছে না একই কারণে। তা ছাড়া তদবির করার সমক্ষমতা আমার নেই। দীর্ঘদিন বিনা বেতনে চাকরির কারণে আমি সংসার নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি।’

অন্যদিকে বিদ্যালয়টির ইংরেজি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক মো. আব্দুর রাজ্জাক হঠাৎ করে ২০১৪ সালে এমপিওভুক্ত হন। কিন্তু তার নিয়োগ ও যোগদান সম্পর্কে কেউ কিছু জানেন না। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৬ সালে তিনি নিয়োগ পেয়েছেন। ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত হাজিরা খাতায় সই রয়েছে। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ডিগ্রি পাস হলেও তার ডিগ্রি পাসের সনদ জাল।

আব্দুর রাজ্জাক তদন্ত কমিটিকে জানান, তিনি নীলফামারীর জলঢাকা থেকে বিএ পাস করেন। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচাইয়ে দেখা গেছে, ফলাফলে তিনি অকৃতকার্য।

জানা গেছে, ডিগ্রি পাসের জাল সনদ ধরা পড়ার পর মনিরুজ্জামানকে দিয়ে ইংরেজি বিষয়ের ক্লাসও নিতে বাধ্য করা হয়। এমনকি অতিরিক্ত ক্লাস চাপিয়ে দেওয়া হয় এই শিক্ষকের ওপর।

মো. মনিরুজ্জমানের এমপিওভুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর বিভাগীয় উপরিচালক মো. আখতারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দুজন শিক্ষকের এমপিও কোড বিদ্যমান থাকায় এমপিও দেওয়ার সুযোগ নেই। জাল সনদের কারণে দুই শিক্ষকের এমপিও স্থগিত থাকলেও এমপিও কোড তো ডিলিট হয়নি। আর সে কারণে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। যদি এমপিও কোড ডিলিট হয়ে ফাঁকা হয়, তাহলে তিনি এমপিওভুক্তি পাবেন।

জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি রাশিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা তো মনিরুজ্জমানের বেতনের জন্য চেষ্টা করছি। কিন্তু বেতন তো হয় না। এসব বিষয়ে বিস্তারিত প্রধান শিক্ষক বলতে পারেন।’

প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, ‘আমি প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগেই জাল সনদের শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। আগের ম্যানেজিং কমিটি নিয়োগ করেছে। ওই সময় সভাপতি ছিলেন বর্তমান অ্যাডহক কমিটির সভাপতি।’

জাল সনদের এমপিও পাওয়া শিক্ষকদের এমপিও কোড বাতিলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে জাল সনদে নিয়োগ পাওয়াদের নাম এমপিও থেকে কর্তন করার জন্য শিক্ষা বোর্ডের আপিল অ্যান্ড আর্বিট্রেশন বোর্ডে আবেদন করেছি।’

আরও অভিযোগ
এদিকে তদন্ত প্রতিবেদনে এই বিদ্যালয়ের আরও অনিয়মের ঘটনা উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, সহকারী শিক্ষক আসাদুজ্জামান ছয় বছরের মাথায় টাইম স্কেল পেয়েছেন। তা ছাড়া চাকরি পাওয়ার ১৩ বছরের মাথায় ২০১০ সালে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড সনদ পেয়েছেন। তিনি বিএডের উচ্চতর স্কেল এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই টাইম স্কেল পেয়েছেন, যা বিধিসম্মত নয়। সরকারি কোষাগারে তার কাছে ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৪১০ টাকা ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।

এ ছাড়া প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের উল্লেখ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, ‘আমার নিয়োগ নিয়ে কোনও অনিয়ম নেই।’




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top