প্রকাশিত:
১ এপ্রিল ২০২৫, ০০:০৪
আজ ঈদের দিন। দেশের নানা শ্রেণির মানুষ নানা তরিকায় সামর্থ্য অনুযায়ী ঈদের আনন্দ উপভোগ করছে। কারও হয়তো ৭ দিনই পোলাও‑কোর্মা খাওয়ার বা নতুন জামা পরার সামর্থ্য আছে। কারও আবার কষ্টেসৃষ্টে এক জামাতেই সই। কেউ হয়তো কেবল ঈদের দিনটায় প্রিয়জনের মুখে মাংস‑ভাত তুলে দিতে টাকা জমিয়েছেন সারা মাস ধরে। আর এই বাংলাদেশে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষ আছে, যাদের ঈদের ১ দিন আগেও পাওনা বেতন‑বোনাসের জন্য রাজধানীর রাস্তায় নামতে হয়। দাবি তাও পূরণ হয় না। ঈদের দিনে তাদের চোখের কোণায় জল ছাড়া আর জমবে কী!
প্রত্যেক দেশেই শ্রমিক শ্রেণি থাকা অত্যাবশ্যক। একটি দেশের অর্থনীতির ইঞ্জিন এই শ্রেণির মানুষই চালায়। এরাই সেই ইঞ্জিনের মবিল। এতেই ইঞ্জিন কার্যকর থাকে, সুস্থ থাকে। আর অর্থনীতির ইঞ্জিন সুস্থ থাকলে দেশের অন্যান্য শ্রেণির মানুষেরও স্বস্তি থাকে। এগিয়ে যেতে পারে দেশ। অথচ আমরা সেই শ্রমিক শ্রেণিকেই সবচেয়ে পিছিয়ে রাখার চেষ্টা করি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিকভাবে।
এই ঈদের আগ দিয়ে দেশে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা জেনে নেওয়া যাক। দৈনিক সমকাল গতকাল ৩০ মার্চ একটি সংবাদ প্রকাশ করেছে। শিরোনাম হলো–‘বেতন বোনাসের দাবিতে বিক্ষোভ-কান্না শ্রমিকদের’। খবরে বলা হয়েছে, “ঈদের আগে বেতন-বোনাস পাচ্ছেন না টিএনজেড গ্রুপের কারখানার শ্রমিকরা। গতকাল শনিবার শ্রম ভবনে বৈঠক হলেও সমাধান হয়নি। শ্রমিকরা ঈদের আগে গ্রামের বাড়ি যেতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তোপের মুখে বেতন-বোনাসের জন্য ঈদের আগে দুই কোটির জায়গায় এক কোটি টাকা বাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। তবে তা মানেননি সাধারণ শ্রমিকরা। তারা ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দেন।”
ঈদের আগে গত ৭ দিন ধরেই টিএনজেড গ্রুপের কারখানার শ্রমিকেরা বেতন‑বোনাসের দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলেন। শেষ পর্যন্ত তারা পুরো বেতন‑বোনাস পাননি। শ্রম ভবনের সামনেই তারা এতদিন ইফতার করেছেন, সেহরি করেছেন। টানা আন্দোলনের পরও মালিক পক্ষ তাদের পূর্ণ বেতন‑বোনাস দেয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি মিটিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকারও পারেনি। তবে কি এ দেশের সরকারের চেয়েও শক্তিশালী এই টিএনজেড গ্রুপ?
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, টিএনজেড গ্রুপের কারখানার শ্রমিক ও মালিকপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের পর শ্রমসচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান আপাতত তিন কোটি টাকা দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। অথচ গ্রুপটির তিনটি কারখানার ৩ হাজার ১৬৬ জন শ্রমিকের পাওনা প্রায় ১৭ কোটি টাকা। শ্রমিকেরা শুরুতে ওই তিন কোটি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও পরে মেনে নিয়ে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত করেন। গত বৃহস্পতিবার একটি কারখানার শ্রমিকদের পাওনার একটি অংশ দেওয়া হয়। অর্থাৎ, ঈদে এসব কারখানার শ্রমিকদের অবস্থা প্রায় রিক্ত। হাতে কপর্দক, চোখে জল।
পুঁজির রমরমার এই যুগে বড় বড় মালিকগোষ্ঠী বরাবরই শক্তিশালী থাকে। পুঁজির গরম দিয়েই পুরো সরকার ব্যবস্থাকে কবজা করতে চায় তারা। এর মূল লক্ষ্য থাকে, নিজেদের নানা অনিয়ম, অবিচারের বৈধতা আদায়। অথচ সরকারের কাজ করার কথা কেবলই জনগণের কল্যাণের হিসাব মাথায় রেখে। শ্রমিকদের অবদান বুঝে সরকারের উচিত এই শ্রেণিকে সুরক্ষা দেওয়া, মালিকগোষ্ঠীর শোষণের হাত থেকে রক্ষা করা। এর জন্যই নানা আইনকানুন প্রণয়ন করা হয়। সরকারকে এই জায়গায় নিপীড়িতের পক্ষ নিয়ে তাদের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করে দিতে হয়। নইলে আর সরকার থেকে লাভ কী?
কিন্তু টিএনজেড গ্রুপের কারখানার শ্রমিকেরা আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করতে অনেকটাই বাধ্য হওয়ার আগে যে অভিজ্ঞতা পেলেন, তাতে অন্তত সরকারের ওপর পরিপূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখা কঠিন। দৈনিক প্রথম আলো’তে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল–‘টিএনজেড গ্রুপ: সচিবের আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত শ্রমিকদের’। সংবাদে বলা হয়েছে, পুলিশ গত বৃহস্পতিবার টিএনজেড গ্রুপের পরিচালক শরীফুল ইসলাম শাহীনকে হেফাজতে নিয়েছিল। তিনি কারখানার যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম বিক্রি করে শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধের আশ্বাস দিয়েছিলেন বলে জানানো হয়েছিল। বেতন-ভাতা পরিশোধের কথা ছিল শনিবার। সেদিন বিকেলে টিএনজেড গ্রুপের পরিচালক শরীফুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন শ্রম মন্ত্রণালয়ের সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। বৈঠকের শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, টিএনজেড গ্রুপের পরিচালক বলেছেন যন্ত্রপাতি বিক্রি করে আপাতত দুই কোটি টাকা দেবেন। ঈদের পরে ৮ এপ্রিল আবার বৈঠক হবে। তিনি যতক্ষণ না শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করছেন, ততক্ষণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকবেন। শ্রমিকেরা সচিবের এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেন এবং বৈঠক শেষে শ্রমসচিব শ্রম ভবন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর গাড়ি অবরোধ করেন। পরে সচিব আবার বলেন, ‘...ঠিক এই মুহূর্তে ব্যাংক থেকে কোনো সাপোর্ট দেওয়া যাচ্ছে না। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে...যদি ব্যাংক খোলা থাকত একটা স্পেশাল লোন ক্রিয়েট করে আমরা সেটার ব্যবস্থা করতে পারতাম...আজ যদি আমরা চেক দিই, সেই চেক তো ব্যাংকে ক্যাশ করা যাবে না। এ কারণে নগদে আমরা তিন কোটি টাকার ব্যবস্থা করেছি।’
শ্রম সচিবের বক্তব্যটি একটু খেয়াল করুন। ব্যাংক থেকে সাপোর্ট না পাওয়ার কথা তিনি এমন একটি দিনে এসে বলছেন এবং সেটিকে পাওনা না দেওয়ার অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন, যেদিন ব্যাংক পূর্বঘোষণা অনুযায়ী বন্ধ। অথচ শ্রমিকেরা আন্দোলন করছেন সেই ২৩ মার্চ থেকে। এতদিন কর্তৃপক্ষীয় সংশ্লিষ্টদের টনক কোথায় ছিল? কাদের কাছে বর্গা দেওয়া ছিল? এমনভাবে শ্রম সচিব কথাগুলো বলেছেন, শুনলে মনে হবে–হুট করেই বন্ধ হয়ে গেছে ব্যাংক, আর সেই কারণেই তাঁরা পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা করতে পারছেন না!
চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়, শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে সরকারি তরফ থেকে এমন গদাই‑লস্করী চাল উপেক্ষা ও অবহেলার এক নির্লজ্জ প্রদর্শনী। ব্যক্তিগত পর্যায়েও এমনটা দেখা যায়। একে তখন ‘ঘোরানো’ বলে। অর্থাৎ, পাওনা দেওয়ার নাম করে ইচ্ছা করে অজুহাত দিয়ে তা বিলম্বিত করা। এতে পাওনা পরিশোধের বিষয়ে সদিচ্ছার অভাব স্পষ্ট থাকে। ভেবে দেখুন একবার, এই কাজ করা হচ্ছে সরকারি তরফে!
এবার শ্রমিকেরা যদি অভিযোগ তোলেন যে, মালিকের পক্ষ হয়ে সরকার আসলে তাদের সঙ্গে প্রতারণা ও ছল‑চাতুরি করছে, তবে সেই অভিযোগ অস্বীকার করা যাবে কোন যুক্তিতে? মানুষ তো আচরণ দেখেই ধারণা তৈরি করে, সিদ্ধান্ত নেয়। ধরুন, আপনি একজনের কাছে টাকা পান। তিনি ঘোরাচ্ছেন। দেনাদারের ক্ষমতা বেশি বলে আপনি একজন মুরুব্বিকে মধ্যস্থতার দায়িত্ব দিলেন। এখন সেই মুরুব্বিই যদি দেনাদারের হয়ে পাওনা পরিশোধ পেছানোর বিষয়ে আপনাকেই উল্টো হেদায়েত দিতে থাকেন, তাহলে আপনি কী বুঝবেন? মুরুব্বিকে কোন নামে ডাকতে ইচ্ছা হবে?
আমাদের দেশের শ্রমিকদের হয়েছে সেই দশাই। মুরগি তাদের বর্গা দিতে হয় শেয়ালের কাছেই!
হ্যাঁ, নিন্দুকেরা বলতেই পারেন যে, শিল্প পুলিশ ও পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন তো জানিয়েছে, কিছু কারখানা ছাড়া বাকিগুলোর শ্রমিকেরা মার্চের অর্ধেক বেতন ও বোনাস পেয়েছেন। বেশির ভাগ কারখানায় ছুটি হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের খবরে তো এসবও এসেছে। এগুলো বাদ দিয়ে মোটে কয়েক হাজার শ্রমিকের চোখের জল নিয়ে এত হল্লার কী আছে?
এমন প্রশ্ন তোলাই যায়। কিন্তু, জানেন তো, এক গামলা দুধে যেমন এক ফোঁটা গোচনাই সব গুণাগুণ নষ্ট করে দিতে পারে, তেমনি কয়েক শতাংশ শ্রমিকও যদি পাওনা না পেয়ে চোখের জল ফেলেন, তাহলে বাকি পুরো প্রচেষ্টাই নষ্ট হয়ে যায়। আমাদের দেশেও সেটিই হয়েছে। আর পাওনা টাকা পরিশোধ করা কি মালিকপক্ষের বদান্যতা? নাকি দায়িত্ব? দেনাদারেরা যদি পাওনাদারের প্রাপ্য পাওনা পরিশোধ করে, তাহলে কি ধন্যবাদের নহর বইয়ে দিতে হবে? তাহলে প্রকারান্তরে মেনে নিতেই হয় যে, আদি জমিদারি ব্যবস্থা থেকে আমাদের মুক্তি এখনও বহুৎ দূর।
দুঃখের বিষয় হলো, ঈদের আগে শ্রমিকদের পাওনা নিয়ে এমন টালবাহানা এ দেশে নতুন নয়। অন্তত বুঝ হওয়ার পর থেকেই আমরা এই সকরুণ বাস্তবতা দেখে আসছি। পার্থক্য হলো, আগে ক্ষমতায় থাকত রাজনৈতিক সরকার। তখন দেশের রাজনীতির পঁচে যাওয়ার ধুয়ো তুলে অনেক দোষই অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যেত। এবার দেশে আছে অরাজনৈতিক সরকার। কিন্তু শ্রমিকের অসহায় কান্না দেখতে হলো এবারও। এর অর্থ হলো, এ দেশে মালিকপক্ষের জমিদারির শেকড় আসলে অনেক গভীরে। রাজনীতি, অরাজনীতি, সুশীল, বুদ্ধিজীবী–সবই সেখানে বাটখারার একটা পাল্লার শূন্যস্থান পূরণের উপাদান মাত্র! অন্তত এবারের অভিজ্ঞতা সেই আশঙ্কারই সংকেত দেয়।
তাই এ দেশে এখনও ঈদের আগে বা ঈদের দিনেও শ্রমিকেরা কাঁদেন। হ্যাঁ, শ্রমিকেরা আগেও কাঁদতেন। পাওনা না পাওয়ার বড় অসহায় সে কান্না। তবে কি আগামীতেও কান্নাই তাদের একমাত্র অবলম্বন হবে? হয়তো তাই। যদি না আমরা কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার মতো করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাড়না অনুভব করি।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন,
‘মানুষ বড়ো কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও
মানুষই ফাঁদ পাতছে, তুমি পাখির মতো পাশে দাঁড়াও
মানুষ বড়ো একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও।…’
আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই একলা দাঁড়ানো, চরম নিঃসঙ্গ শ্রেণিটি হলো শ্রমিক। যৌক্তিক দাবিতে এই নিঃসঙ্গ শ্রেণিটির পাশে যতজন এসে দাঁড়াবে, সেই পরিমাণই আদতে জানিয়ে দেয় এ দেশের ‘নতুন’ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আসলে কতটা!
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
মন্তব্য করুন: