আগেই প্রকাশ পায় আত্মহত্যার লক্ষণ, দ্রুত নিতে হবে ব্যবস্থা

আগেই প্রকাশ পায় আত্মহত্যার লক্ষণ, দ্রুত নিতে হবে ব্যবস্থা

মামা, দরজা খোলা। হাতলের হ্যান্ডেল চাপ দিয়ে ভেতরে ঢুক’— বাসায় প্রবেশের দরজায় সাঁটানো ছিল কম্পিউটার কম্পোজ করা এমন লেখা। ধানমন্ডির একটি বহুতল ভবনের পঞ্চম তলার এই ফ্ল্যাটটিতে একাই থাকতেন ব্যবসায়ী আবু মহসিন খান। যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভে এসে মাথায় গুলি করে ‘আত্মহত্যা’ করেন গত ২ ফেব্রুয়ারি। পরে পুলিশ মরদেহের পাশ থেকে একটি সুইসাইড নোট পায়। যেখানে লেখা রয়েছে, ‘ব্যবসায় ধস নেমে যাওয়ায় আমি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। আমার সঙ্গে অনেকের লেনদেন ছিল। কিন্তু তারা টাকা দেয়নি। আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।’ আর ফেসবুক লাইভে নিজের শারীরিক অবস্থা ও পরিবারের সদস্য ছাড়াও ‘নিজের একাকিত্ব’, ‘ব্যবসায় লোকসান’, ‘কাছের মানুষের প্রতারিত হওয়া’ প্রভৃতি বিষয় উল্লেখ করে নিজের লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে মাথায় গুলি করে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েন মহসিন খান।

মহসিনের স্ত্রীর বোন সম্পর্কের এক নারী উপস্থিত সাংবাদিকদের সেদিন জানান, কয়েক দিন ধরে ফেসবুকে তিনি (মহসিন) হতাশামূলক স্ট্যাটাস দিতেন। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মহসিন খান তাকে বলেছেন— কী আর বলবো তোদের, একা থাকার কষ্ট তোরা বুঝবি না।

এদিকে গত শুক্রবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) বগুড়ার শেরপুরে ‘মোটরসাইকেল কিনে না দেওয়ায়’ বাবা-মায়ের ওপর অভিমান করে গলায় ফাঁস দিয়ে আলী সজল ওরফে রাহাদ (১৬) নামে এক স্কুলছাত্র আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেছে। একইদিন বিকালে রাজধানীর খিলগাঁওয়েও ‘ঘর ঝাড়ু দেওয়া নিয়ে’ মায়ের সঙ্গে অভিমান করে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরী আত্মহত্যা করে। আর সবশেষ গতকাল রবিবারও (২৭ ফেব্রুয়ারি) গাজীপুরের কালীগঞ্জে ‘মোবাইল ফোন ব্যবহারে বাধা দেওয়া’য় মায়ের সঙ্গে অভিমান করে ১১ বছরের এক কিশোরী আত্মহত্যা করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক নির্যাতন, কলহ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, পরীক্ষা ও প্রেমে ব্যর্থতা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, প্রাত্যহিক জীবনের অস্থিরতা, অভিমান, নৈতিক অবক্ষয়, মাদক ইত্যাদি কারণে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আত্মহত্যা প্রবণতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দশম। দেশে প্রতি বছর দেশে কমপক্ষে ১৩ হাজার থেকে ৬৪ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৩০ জন মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এর মধ্যে নারী-পুরুষ-শিশু সব বয়সের মানুষ রয়েছে। তবে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি, তাদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা বেশি হলেও পুরুষের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়।

মানুষ কেন আত্মহত্যার দিকে যায়, কেন নিজের জীবন আর পরিবার স্বজনদের ফেলে মৃত্যুকে বেছে নেয়— এ বিষয়ে মনোরোগ বিশষেজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন কারণে জীবনের প্রতি অতিষ্ঠ হয়ে এক শ্রেণির মানুষ আত্মহত্যা করে- তারা আত্মহত্যা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে, জানান দিয়ে। আরেকটি শ্রেণি আত্মহত্যা করে হুট করে। চিকিৎসকরা বলছেন, আত্মহত্যাকে এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয়, ইমপালসিভ এবং ডিসিসিভ। হুট করে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া ইমপালসিভ আর সিদ্ধান্ত নিয়ে ভেবে চিন্তা করে যে আত্মহত্যা হয় তাকে ডিসিসিভ বলা হয়।

মনোরোগ বিজ্ঞানী ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মহসিন খানের আত্মহত্যা ছিল ডিসিসিভ। আগে থেকেই এটা ডিসাইডেড ছিল। আর রাহাদের আত্মহত্যা ইমপালসিভ।

কেউ আত্মহত্যা প্রবণ হয়ে উঠছেন কি না কীভাবে বোঝা যাবে— জানতে চাইলে ডা. হেলাল বলেন, ইমপালসিভ এবং ডিসিসিভ আত্মহত্যা যারা করেন তারা সবাই কিছু না কিছু লক্ষণ প্রকাশ করে, তবে দুই ধরনের আত্মহত্যার লক্ষণ প্রকাশ দুই রকম। যারা ডিসিসিভ, তারা সবসময় হতাশার কথা, মৃত্যুর কথা বলে। সম্পত্তি উইল করে রেখে যায়, ফেসবুকে বিভিন্ন নেতিবাচক বা হতাশার কথা বলে, বন্ধু বা স্বজনদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না, কোনও ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানে তাদের পাওয়া যায় না। অর্থাৎ তারা নিজেকে গুটিয়ে নেয় সবকিছু থেকে।

আর এসময় পরিবার বা আশপাশের মানুষ এ ধরনের মানুষকে আরও মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় বলে জানান ডা. হেলাল। তিনি বলেন, ‘যে মৃত্যুর কথা বলে, সে কখনও মরে না- এমন কথা বলে তাকে উপহাসও করা হয়। এটা আমাদের দেশে কমন ফেনোমেনা, আর এটাই অনেক বড় ভুল আমাদের। বিজ্ঞান বলে, যে বা যারা মৃত্যুর কথা বলেন, তিনি বা তারাই আত্মহত্যা করেন।’

‘তিনি যে বলেন, আমি বাঁচতে চাই না, সেটা তার অবচেতন মনেই মুখ দিয়ে প্রকাশ হয়ে যায়’, বলেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ।

আর ইমপালসিভ আত্মহত্যা যারা করেন, তাদের ব্যক্তিত্বে ও আচরণে পরিবর্তনে আসে। নিজেকে আঘাত করা, যেমন- হাত কাটা, হুট করে রেগে যাওয়া, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, ঘুমের ওষুধ খাওয়া, কারও কথা সহজভাবে নিতে না পারার মতো বিষয়গুলো তাদের মধ্যে দেখা যায়। আর শুধু আত্মহত্যার জন্য নয়, তাদের ব্যক্তিত্বের প্রকরণটাই এরকম। আর ব্যক্তিত্বের এ প্রকরণের জন্য তারা ইমপালসিভ আত্মহত্যা করেন বা আত্মহত্যার প্রবণতা তাদের মধ্যে থাকে।

মা বকা দেওয়ায়, প্রেমে ব্যর্থ হওয়ায় কিংবা পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করার মতো বিষয়গুলোতে আত্মহত্যা করা ইমপালসিভ আত্মহত্যা উল্লেখ করে এই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এই ইমপালসিভ এবং ডিসিসিভ লক্ষণগুলো যাদের মধ্যে দেখা যায়, তারা আত্মহত্যা করে ফেলতে পারেন। তবে ডিসিসিভ আত্মহত্যার মূল কারন ডিপ্রেসন বা বিষণ্ণতা। বিষণ্ণতার যে কোনও পর্যায়ে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা সংকেতগুলো অনেকসময় পাই। বিশেষ করে পরিবার এবং বন্ধুসহ কাছের মানুষ। কিন্তু সেটা দেখেও ইন্টারপ্রেট করতে পারি না। আর কখনও যদি কেউ বুঝতেও পারেন বিষয়টাকে তখন বুলিং বা ব্যাঙ্গ করার পর্যায়ে নিয়ে যান।’

আত্মহত্যা থেকে বাঁচার জন্য রোগীর নিজের, পবিবার-স্বজনসহ বিশেষজ্ঞদের ভুমিকা পালন করতে হবে বলে জানান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সালাউদ্দিন কাউসার বিপ্লব। তিনি বলেন, ‘যদি আগে থেকেই মানসিক রোগে আক্রান্ত থাকেন, তাহলে রোগটা বাড়লো কিনা- সে খেয়াল রাখতে হবে। আর যদি মানসিক রোগে আক্রান্ত না থাকেন তাহলে একজন মানুষের আচরণ, চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন হয়ে গেল কিনা, সে আগে থেকে অন্যরকম হয়ে গেলা কিনা, মাদকাসক্ত হতে হতে সে একা হয়ে গেল কিনা, কথা বন্ধ হয়ে গেল কিনা, আইসোলেটেড হয়ে গেল কিনা- ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এগুলো।’

এ ধরনের যে কোনও লক্ষণ দেখা দিলে তাকে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যেতে হবে, পরামর্শ এই চিকিৎসকের। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, রোগী যদি বুঝতে পারেন তার মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে তাহলে সেটা সিভিয়ারিটির আগেই তাকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে, সাহায্য নিতে হবে, সেটা চূড়ান্ত অবস্থায় যাওয়ার আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই নিজেকে বাঁচানো যাবে।

যেসব কারণে কোনও ব্যক্তির আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়তে পারে সেসব বিষয়কে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে বলেও মনে করেন ডা. সালাউদ্দিন কাউসার। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি একইভাবে ভূমিকা নিতে হবে পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদেরও। আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিকে সময় দিতে হবে, তাদের কথা শুনতে হবে এবং সর্বোপরি তাদের এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top