বায়ুদূষণের কারণে মিনিটে ১৩ মৃত্যু

 বায়ুদূষণের কারণে মিনিটে ১৩ মৃত্যু

গোটা পৃথিবী যখন শতাব্দীর ভয়াবহতম মহামারী অতিক্রম করছে, তখন নানা দূষণে দূষিত হয়ে পড়েছে আমাদের গ্রহ। ক্রমেই বাড়ছে ক্যানসার, হাঁপানি, হৃদরোগের মতো রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য বলছে, বর্তমানে পৃথিবীতে প্রতি মিনিটে ১৩ জনের মৃত্যু হয় শ্বাসকষ্ট, স্ট্রোক এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে, যার অন্যতম কারণ দূষিত বায়ু সেবন। অবস্থা এমনই যে পৃথিবীতে প্রতি ১০ জনে ৯ জনই বর্তমানে দূষিত বায়ু সেবনে বাধ্য হচ্ছেন। এ বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ জীবাস্ম জ্বালানির ব্যবহার। বিশেষ করে জ্বালানি তেল, কয়লা এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের যথেচ্ছ ব্যবহার বায়ুকে দূষিত করে তুলছে মারাত্মকভাবে। পাশাপাশি রয়েছে ধূমপান। শুধু ধূমপানের কারণে বছরে ৮০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। যখন এমন পরিস্থিতিতে অন্যান্য দেশের মতো আজ ৭ এপ্রিল বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস’। দিনটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘আমাদের গ্রহ, আমাদের স্বাস্থ্য’। দিবসটি পালন উপলক্ষে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য বিষয়ে কাজ করে এমন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

ডব্লিউএইচও বলছে, প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ১ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু পরিহারযোগ্য পরিবেশগত কারণে হয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে জলবায়ুু সংকট, যা মানবতার মুখোমুখি একক বৃহত্তম স্বাস্থ্য হুমকি। এ ক্ষেত্রে

রাজনৈতিক, সামাজিক এবং বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তগুলো জলবায়ু ও স্বাস্থ্য সংকটকে চালিত করছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ অস্বাস্থ্যকর বাতাসে শ্বাস নিতে বাধ্য হচ্ছে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাপী এখনো সাড়ে ৩০০ কোটির বেশি মানুষ নিরাপদ পয়োনিষ্কাশন ও ২০০ কোটি মানুষ বিশুদ্ধ পানি পানের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। যার কারণে বছরে অন্তত ৮০ লাখ মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। তা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বন্যা ইত্যাদি কারণে ২০০ কোটি মানুষ ডেঙ্গুর মতো ভয়াবহ রোগের ঝুঁকিতে বসবাস করছে।

বাংলাদেশে বায়ুদূষণের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ইটভাটা, দীর্ঘমেয়াদি অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ কার্যক্রম, ময়লা আবর্জনায় আগুন দেওয়া, সড়কের ধারণ ক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ির কলো ধোঁয়া নির্গমন ইত্যাদি। এ ছাড়া নির্বিচারে বন ধ্বংস ও গাছপালা কাটাও পরোক্ষভাবে বায়ুদূষণে ভূমিকা রাখছে।

সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার ১১৭টি দেশ-অঞ্চলের ৬ হাজার ৪৭৫টি শহরের বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে বিশ্বে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৪০ হাজার শিশুর মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল বায়ুদূষণ। ওই বছরে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় বায়ুর মান সবচেয়ে খারাপ ছিল। বিশ্বের ৫০টি সবচেয়ে দূষিত শহরের মধ্যে ৪৬টিই এ অঞ্চলে অবস্থিত। সবচেয়ে দূষিত শহর হিসেবে এ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ঢাকার নাম। এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স ডিপার্টমেন্টের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. খালেকুজ্জামান বলেন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য নির্মল পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে বায়ুদূষণ নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কারণ আছে। বিশেষ করে দেশের শহরগুলো বায়ুদূষণের আধার। নগরগুলোতে বায়ুদূষণের প্রধান কারণ পরিবহন জ্বালানি। এ ছাড়া নগর উন্নয়ন ও এ ক্ষেত্রে করণীয় হলো উন্নয়ন কার্যক্রমের সময় পরিবর্তন করা, এ ছাড়া বাতাসে কার্বন কমাতে ট্রাফিক জ্যাম দূর করতে হবে। স্বাস্থ্যহানিী ক্ষেত্রে পানির দূষণও আরেকটি বড় কারণ। পানি ফুটাতে প্রচুর জ্বালানি ব্যয় করা হয়, যা বাতাসে কার্বনের মাত্রা বাড়াচ্ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। এ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সর্বস্তরে বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করতে হবে।

প্রাভা হেলথের চিফ মেডিক্যাল অফিসার ডা. সিমীন মজিদ আখতার বলেন, মানবসৃষ্ট দূষণ পৃথিবীর পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থানের জন্য খুবই ক্ষতিকর। বায়ু, পানি, তেজস্ক্রিয়তা ইত্যাদি দূষণ জলবায়ু পরিবর্তনে নেতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি বিভিন্ন মরণব্যাধির জন্ম দিয়ে মানবস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। অন্যদিকে, অস্বাভাবিক জীবনযাপন ও অস্বাস্থ্যকর খাবার তো আছেই। কিন্ত এ গ্রহের ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে সচেতনতা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি। বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশের সুরক্ষা বলয় মজবুত করা, মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও খ্যদ্যাভ্যাস স্বাস্থ্যকর করে তোলা, চিকিৎসা খাতে প্রযুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন ঘটানো, এ সবই একে অপরের সঙ্গে জড়িত। আমাদের বুঝতে হবে যে, নিজেদের সুস্থ রাখতে পরিবেশের সুস্থতা প্রয়োজন, আর মানবসভ্যতাকে বাঁচাতে হলে আগে বাঁচাতে হবে বিশ্বকে।

এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে আজ বেলা ১১টায় ওসমানী মিলনায়তনে আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। এ ছাড়া দিবসটি উপলক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সকাল ৯টায় র‌্যালি বের হবে।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top